আজ কমরেড লিও ট্রটস্কি’র হত্যা দিবস, সিপিএমের শূন্যে পরিণত হওয়ার পেছনে স্তালিনীয় কূপমন্ডুকতা

0
70

- Advertisement -

ড. অলোক সরকার ফেলো,

সেন্টার ফর পাবলিক ডায়ালগ

৩৬৫ দিন। বলশেভিকের শেষে পার্টি কংগ্রেসের পরেই ডেনমার্ক সম্মেলনে ট্রটস্কি বললেন, সমাজতন্ত্র হবে বিশ্বব্যাপী নতুবা তা হবে না। কেবল রাশিয়ার বুকে পুঁজিবাদকে বদলে কুপমণ্ডূক বলশেভিক বিপ্লবে জয়লাভ করে সাম্যবাদের কোনও প্রকৃত লাভ হবে না। একই সঙ্গে সারা বিশ্বে পুঁজিবাদকে উৎখাত করে সাম্যবাদ আসতে হবে। প্রয়োজনে সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে। ট্রটস্কি চাননি বলশেভিক বিপ্লব এভাবে কুপমণ্ডূক হয়ে পড়ুক। ইতালি, স্পেন,জার্মান,লাতিন আমেরিকা সর্বত্র ট্রটস্কিপন্থীদের বাড়বাড়ন্ত দেখে শঙ্কিত ছিলেন লেলিন, স্তালিন, বুখারিনরা। ১৯৩০ থেকে ১৯৪০ এর মধ্যে এই ফাঁটল এমন জায়গায় পৌঁছল স্তালিন পার্টিতে কোনঠাসা হওয়ার ভয়ে এক্সপেল করলেন ট্রটস্কিকে। তারপর দেশ ছাড়লেন।কমিউনিস্ট পার্টির যে কুপমণ্ডূকতার বিরুদ্ধে লড়ে গুপ্তহত্যার শিকার হলেন ট্রটস্কি, সেই কুপমণ্ডূকতার বীজ বপন করে মহিরুহে পরিণত হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের সিপিএম। লড়াই করে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বাংলার মধ্যে নিজেদের আটকে রেখে কেবল একমুখী নীতি, আদর্শ ও ভ্রান্ত রাজনৈতিক শত্রু নির্বাচন করে আজ উলটো গুনতিতে শূন্যতে এসে দাঁড়িয়েছে সিপিএম। বিপ্লব ও বিশ্বাসঘাতকতা বইতে ট্রটস্কি তীব্র সমালোচনা করে বলেছিলেন, কমিউনিস্টদের আমলাতন্ত্র, স্বজনপোষন সমাজতন্ত্রের মূল কাঠামোকে একদিন ভেঙে দেবে। স্তালিন মানেননি। কিন্তু বিশ্বজুড়ে একে একে কমিউনিস্ট দেশগুলোর পতন ট্রটস্কিবাদকেই সত্য প্রমান করে। বাংলার সিপিএম,জ্যোতি বসু থেকে বুদ্ধদেব পর্যন্ত লেলিন ও স্ট্যালিনের পথ অনুসরণ করে সেই একই শূন্যতায় পৌঁছেছে। আটের দশকের শেষ দিক থেকে সিপিএমের যে কেবল মমতা বিরোধিতা, তা আজও চলছে, সেটাই সবচেয়ে বড় উদাহরণ। কে প্রকৃত শ্রেণী শত্রু তা গত তিন দশক আগেই সিপিএম গুলিয়ে ফেলেছে। মমতা যখন কগ্রেসে, সিপিএম এর প্রধান শত্রু তিনি। মমতা যখন তৃণমূল দল গড়লেন, তখনও তিনি শত্রু। সহিষ্ণুতার প্রশ্নে,ধর্মনিরপেক্ষতার লড়াইয়ে যখন  ভাজপার বিরুদ্ধে এক লড়ছেন মমতা, তখনও মমতাই সুজন, সেলিমদের শত্রু, ২০২১ সে দাঁড়িয়ে মানুষের রায়ে তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসার পরেও মমতাই একমাত্র শত্রু। কি আশ্চর্য ! অন্যদিকে নিজেদের বাংলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখে আজীবন ক্ষমতায় থাকার ভ্রান্ত স্বপ্ন নিয়ে চলেছে সিপিএম। ৩৪ বছর শুধু ক্ষমতাভোগ ছাড়া আর কিছুই করেনি।স্তালিনের মতাদর্শ আঁকড়ে বাংলার বুকে শতাব্দীপ্রাচীন কচ্ছপের মত স্থবির হয়ে বেঁচে থাকতে চেয়েছে। ঠিক যেভাবে একদিন শ্যাওলা পড়া, ঘুন খাওয়া কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়েছিল, লেনিন ও স্তালিনের পার্টি লাইন নিয়ে ভাবনার সংকীর্ণতার জন্য, ঠিক সেভাবেই জড় থেকে উপড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে সিপিএম।স্তালিনবাদের আমলাতন্ত্র কাকে বলে, কিভাবে তাদের শাসনব্যবস্থা ও প্রশাসন নামক বৃহৎ যন্ত্রে মসৃণ নাটবল্টুর মত ব্যবহার করতে হয়, তা জ্যোতিবাবুরা দেখিয়ে গিয়েছেন। আর স্বজনপ্রীতি কি তা সিপিএম দেখিয়ে গিয়েছে ৩৪ বছরে। সারা রাজ্যজুড়ে ভুমিসংস্কারের যে ঢাক সিপিএম এখনো বাজায় তাতে যত কৃষকের উপকার হয়েছে, তার তুলনায় অনেকগুন বেশি উপকৃত হয়েছে পার্টির ক্যাডার আর পার্টি সমর্থিত জোতদাররা। অপারেশন বর্গার নামে জমির পর জমিতে লাল পতাকা পুঁতে দেওযার পরে শহরে, বিশেষত কলকাতায় পার্টির সমর্থক, বুদ্ধিজীবী, লেখক, শিল্পীদের মনে ধারণা জন্মায় যে, গ্রামে গরিব মানুষ জমি পেয়েছেন, তাঁরা সুখে আছেন। একদিকে জমি হারিয়ে এক শ্রেণীর বেকার তৈরি হল। শহরে বাড়ল ভিখারি। গ্রাম থেকে কর্মহীন, অর্থহীন মানুষের দল ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে আটের দশক থেকে কলকাতার রাস্তায় ছেয়ে গেল।  গ্রামের মানুষের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেবার কৌশল হল বর্গা আইন। লক্ষ্যটা ছিল এই যে, গ্রামে শুধু অতি ক্ষুদ্র কৃষক থাকবে, শ্রমিক থাকবে যারা চিরকাল বিপিএল তালিকাভুক্ত হবার জন্য লাইনে দাঁড়াবে, যারা হবে পার্টি ক্যাডার, পরবতীকালে এরাই হার্মাদ। আর শহরে একশ্রেণীর স্তাবক, পেটোয়া, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, অর্ধ ক্যাডারশ্রেণী মধ্যবিত্ত সমাজকে প্রভাবিত করবে, আকর্ষণ করবে সিপিএম এর দিকে। লেনিন ও স্তালিনপন্থী হয়ে ভ্রান্ত পথে কুপমণ্ডূক সিপিএম এই ভাবেই খাদের কিনারায় এসে এখন নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। 

Advertisement

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here