Movie Review: যৌনতার বাড়াবাড়ি নেই, তীব্র রাজনৈতিক , অশালীন নয় সাহসী, সুব্রত সেন এর ছবি সমরেশ বসুর ‘প্রজাপতি’

0

Last Updated on July 23, 2023 12:25 PM by Khabar365Din

৩৬৫ দিন। সৌগত সরকার। অশ্লীলতার দায়ে ১৭ বছর নিষিদ্ধ থাকা সমরেশ বসুর উপন্যাস প্রজাপতি নিয়ে সুব্রত সেনের ছবি শুধুমাত্র সমালোচকদের প্রশংসাই পায়নি,একই সঙ্গে দর্শকদের মধ্যে একটা চাঞ্চল্য ফেলেছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে,যারা উপন্যাসটি পড়েনি,কিন্তু নিষিদ্ধ হওয়ার গল্পটা জানে। অন্যদিকে যাদের সাহিত্যটি পড়া, তাদের কৌতুহল ছিল চলচ্চিত্রায়ণ কতটা সফল হল তা জানতে। দুটি ক্ষেত্রেই ছবিটি সফল। প্রথমত, যাদের কাছে সাহিত্যটি অজানা, তারা তাদের মত করে ছবিটির বিষয়,দর্শন উপভোগ করেছে। আর যারা সমরেশ পড়েছেন তারা দেখেছেন, পরিচালক সাহিত্যর নির্যাস থেকেও বিচ্যুত হননি। সত্তরের দশক থেকে সময়কে এগিয়ে আট,নয় দশক হয়ে বর্তমান সময়ে শেষ হওয়া ছাড়া মূল সাহিত্য অবিকৃত রয়েছে।

পরিচালক সাহিত্যের কোনও পরিবর্তন (এখন অনেক পরিচালকই অতি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যের মধ্যেও নিজের ভাবনা,ক্রিয়েটিভ এলিমেন্ট এমনকি নতুন চরিত্র নিয়ে আসেন) করেননি। নতুন কোনও এলিমেন্ট যোগ করেন নি। মূল সাহিত্য অবিকৃত রেখে জাস্ট গল্প বলেছেন,তাই ছবিও দাড়িয়ে গিয়েছে। আফটার অল সমরেশের সাহিত্য। সুব্রতর ছবিতে কোনও এলিমেন্ট বাদ যায়নি। শ্রমিক আন্দোলনের নামে মালিকের সঙ্গে সমঝোতা করা কমিউনিস্টরা, নিজেদের স্বার্থের জন্য হাতে হাত মেলানো ডান বাম রাজনীতি, মাস প্রোডাকশনের মত সমাজবিরোধী তৈরি, এই সাহসী এবং তীব্র রাজনৈতিক সত্যতা সুব্রতর ছবির ভরকেন্দ্র। আরবান সমস্যা,দাম্পত্যের জটিলতা কিংবা হোয়াইট কলার ক্রাইসিস নিয়ে অসংখ্য বাংলা ছবির ভিড়ে সাবঅল্টার্নদের নিয়ে ছবি তৈরি সহজ নয়।

ঘর্মাক্ত শরীরে বাংলা খাওয়া ছবির নায়ক আর অতি নিম্নবিত্ত পরিবারের মেকআপহীন নায়িকার মাচার ডিম পাউরুটি নাচের ছবি মাল্টিপ্লেক্সে পপকর্ন খেতে খেতে কলাইয়ের থালায় মোটা চালের ভাত সবজি,শ্রমিক আন্দোলনের নামে কমিউনিস্টদের রাজনৈতিক মেশিনারির ব্যবহার,নিতে পারবে কিনা, তা নিয়ে খানিক দ্বিধায় ছিলাম। কিন্তু সমরেশ বসুর সাহিত্যগুণ, কোনও এক্সপেরিমেন্ট না করে পরিচালকের সোজাসুজি গল্প বলার ধরণ আর দুই অভিনেতা সুব্রত দত্ত ও মুমতাজ সরকারের অভিনয় হিসেব উল্টে দিল। প্রথম সপ্তাহ হইহই করে চলে,দ্বিতীয় সপ্তাহেও সুব্রত সেনের ‘ সমরেশ বসুর প্রজাপতি ‘ ছবি হলে প্রচুর দর্শক টানছে। উপন্যাসে লেখক তাঁর নিজস্ব স্টাইলে নারী শরীরের,নারী পুরুষের ঘনিষ্ঠতার মুহূর্ত যেভাবে বর্ণনা করেছেন, তা সাহিত্যগুণে টইটুম্বুর। সুখেনের প্রথম ও দ্বিতীয় প্রেমিকা জিনা কিংবা শিখার শরীরের বর্ণনা সেখানে রবিশঙ্করের সেতারে মালকোষের সংরাগ।

লেখক লিখছেন, ওর গোলাপী আঁচল খসা দেখে। চুলের আলগা খোঁপা খুলে পড়েছে। আর ডোরা কাটা কাটা ব্লাউজটা তো দারুণ;ভাবলেই নিজের হাতটা চিবিয়ে খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে। খেতে হবে না। দু’ হাত পাইপ প্যাণ্টুলের পকেটেই পুরে দিই। কিন্তু, সত্যি, ওর ব্লাউজের নীল, লাল, হলদে রঙের ডোরাগুলো কাঁধের কাছ থেকে নামতে নামতে এমন ঠেলে উঠেছে, অদ্ভুত! আর কেমন, উঠেছে যেন ঢেউ দিয়ে, নেমেছে গোল হয়ে। বুকের দু’ দিকের কোন দিকেই কাপড় নেই। বোতাম পাটিতে বোতাম নেই, ঠিক উচ্চিংড়ের মত দুটো সেপটিপিন লাগানো। যেন চেয়ে আছে। গোটা আঁচলটা বাঁ হাতের ওপরে। ব্লাউজের নিচে ও আর কিছু পরেনি। পরলে ঠিক বোঝা যেত।

আর ওগুলো পরলেই আসল জিনিস সব এমন ঠাস বুনোট খোঁচা পাথরের মতন লাগে; বিচ্ছিরি, ..একটা মানুষ কোথাও নেই, মাথার ওপরে তো খালি আকাশ। সামনে লম্বা আখের খেত। দুবাঘাসের ওপর প্রজাপতিটা আমার বুকের কাছে। কিন্তু ভদ্রলোক’রা উপন্যাসটা হজম করতে পারেননি। তাই প্রথমে একজন ভদ্রলোক অভিযোগ তোলেন। তারপর আদালত সরকারকে নির্দেশ দেয় উপন্যাসটা নিষিদ্ধ করার জন্য। সাবঅল্টার্ন মানুষের যে ভাষা, সেটা রয়েছে উপন্যাসে। নারী শরীরের বর্ণনা যেভাবে এসেছে, সেটা অনেকের অশ্লীল মনে হয়। হয়তো সে কারণে এই উপন্যাসটি নিষিদ্ধ হয়েছিল। ভদ্রলোক’রা উপন্যাসটা হজম করতে পারেননি।

সুব্রত এর আগেও সমরেশের বিবর নিয়ে ছবি করেছেন। সমরেশ এর ধরনটা ওর অজানা নয়। এই ছবিতে তার মাস্টার স্ট্রোক হল, তিন বয়সের সুখেনকে সমান্তরাল ভাবে একই সঙ্গে যাত্রা করিয়ে। উপন্যাসে সুখেনের স্মৃতি চারণের মধ্যে দিয়ে পাঠক তার ছেলেবেলা এবং কলেজ জীবনের হদিস পায়। এখানে জটিলতায় না গিয়ে সুব্রত সুখেনের তিন বয়সকে তিন আলাদা চরিত্র,তিন আলাদা গল্প হিসাবে ট্রিট করেছেন। সাহিত্য না পড়া দর্শক তিন আলাদা চরিত্র ধরেই নিজদের স্ট্যান্ড পয়েন্ট ঠিক করে। শেষে তিন সুখেন এক বিন্দুতে মিলে যাওয়ায়, দর্শক যেন জাজমেন্ট দেওয়া থেকে রিলিফ পায়, একই সঙ্গে উপভোগ করে। ছবির প্রথম প্লাস পয়েন্টে এটাই। দ্বিতীয়ত, বড় সুখনের চরিত্রে সুব্রত দত্ত দুর্দান্ত।

ন্যাশনাল ßুñল অফ ড্রামার প্রাক্তনী সুব্রতকে হিন্দি চলচ্চিত্র জগৎ ব্যবহার করলেও,বাংলা ইন্ডাস্ট্রি কেন যথাযথ ব্যবভার করতে পারল না, ভাবতে অবাক লাগে। কোথাও কোনও মনোটনি নেই,শেষ দৃশ্য ছাড়া কোথাও আপ টিউনে সংলাপও বলেননি। অনেক আন্ডার অ্যাকটিং করে গেলেন। চারটি দৃশ্যে তিনি অনবদ্য। আর অবাক করলেন মমতাজ। ডিগ্ল্যামারাইজড চরিত্র করছেন বেশ কিছুদিন। দক্ষিণে মধবনের সঙ্গে শালা খারুস,ভেঙ্কটেশ এর সঙ্গে গুরু,রক্তকরবী,সাবাস মিঠুতে ঝুলনের চরিত্রে সুনাম কুড়িয়েছেন। কিন্তু শিখার চরিত্রকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গিয়েছেন মমতাজ। এর আগেও সুব্রতর সঙ্গে ছবি করেছেন। সুব্রত ওর ওপর যে আস্থা রেখেছেন, তা সঠিক মাত্রায় ফেরত দিয়েছেন মমতাজ।

অতি নিম্নবিত্ত পরিবারের শিখার মেকি উচ্ছ্বলতাকে ঢেকে দেয় তার নারীত্ব। সুখেনকে চড় মারার পরের দুটি দৃশ্য অনেকদিন মনে থাকবে। তরুণ সুখেনের ভূমিকায় ঋতব্রত যথাযথ। ক্যামেরায় বাসব মল্লিক খুব ভালো কাজ করেছেন। আরবের ডিম পাউরুটি গানটি তো অসম্ভব হিট। তবে ছবিতে আলোর ব্যবহার কিছু দৃশ্যে অসম লেগেছে। ষাট পাওয়ারের বাল্ব জ্বলছে ঘরে,অথচ দেওয়ালে ঝোলানো হ্যারিকেন জ্বলছে কেন। বা সুখেনদের মদের থেকে পেচ্ছাপ করতে যাওয়ার জায়গায় এত লাল আলোর ফ্ল্যাশ ভালো লাগেনি। আর যেটা নেই তা হল যৌনতা। প্রায় যৌনতা শূন্য হয়েও ছবিটি সাহিত্যকে ধরে রেখেছে। সব মিলিয়ে চলতি বছরে মুক্তি পাওয়া ছবিগুলোর মধ্যে অবশ্যই দাগ রেখে যাচ্ছে সমরেশ বসুর প্রজাপতি।