শুধু ফুটবল খেলা নয়, স্বাধীনতার যুদ্ধ

0

Last Updated on September 21, 2021 11:18 PM by Khabar365Din

- Advertisement -

৩৬৫ দিন ।‌ সৌগত সরকার


খেলার মাঠ, মানুষকে বাঁধে, ভাঙে না। 
সম্মুখ সমরে কোমর বাঁধার সময় এসে গিয়েছে। 
তোমাদের যখন দেখি, আমার স্বপ্নের দেশকে দেখতে পাই 
আসমুদ্র হিমাচল ভারতবর্ষ, আর হাতে গোনা কটা ইংরেজ এতো সাহস!
আমার দেশে আমারই ভাইয়ের রক্ত নির্বিচারে শুষে নেয়? 


কালকে মরে যাব, কিন্তু হেরে ফিরব না। এই সব সংলাপ প্রমান করে, এ ছবি স্বাধীনতা যুদ্ধের ছবি, এ ছবি পরাধীন দেশের কোটি কোটি মানুষের সংগ্রামের ছবি। ভুল ছিল আমাদের পরিমাপে, আমাদের বিচারে। এসভিএফ এর প্রযোজনায়,ধ্রুব ব্যানার্জি শুধু একটি বিগ বাজেটের পিরিয়ড পিস বানাচ্ছেন না, আরও বড় কিছু নিয়ে আসছেন, যা বাংলা চলচ্চিত্রের সামনে এক নতুন এভিনিউ খুলে দেবে। ঐতিহাসিক এক চরিত্র করতে গিয়ে দেব বাইচুং ভুটিয়ার কাছে ফুটবল স্কিল শিখছেন বলে যত সংবাদে লাফালাফি হয়েছে, আসলে সেটা কিছুই নয়। দেব আরও বড় ব্যাপ্তিতে সম্পূর্ন ব্যতিক্রমী এক চরিত্রে অভিনয় করছেন, যা তাঁর অভিনয় জীবনের অন্যতম মাইলস্টোন হতে চলেছে। ফুটবল স্কিল শেখা, দল বেঁধে ফটোশুট এ সব সব নগন্য।গোলন্দাজ ছবির অফিসিয়াল ট্রেলার দেখে বুঝলাম, এই ছবি বাংলা চলচিত্রের দিশা বদলে দেবে, ধ্রুব সাধারণ কোনো ঐতিহাসিক চরিত্র বেছে ছবি করছেন না, কেবল ইংরেজদের ফুটবলে হারানোর গল্প নয় এটা। তীব্র রাজনীতিক প্রেক্ষাপট, সামাজিক দ্বন্দ, জাগ্রত হয়ে ওঠা স্বাধীনতার সংগ্রাম এবং সর্বোপরি বলা যায়- নেভার ব্যাক ডাউন মন্ত্রে দীক্ষিত এক ঐতিহাসিক চরিত্র। দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ফুটবলারের অদম্য জেদের কাছে ছিঁড়ে পড়ছে দাসত্বের শৃঙ্খল, ডান পায়ের জোরালো শটের ঔদ্যত্ব, চামড়ার বল ভেঙে দিচ্ছে সীমানার বেড়া,যিনি নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারী, তিনিই দেব। ১৪ বছরের চলচিত্র জীবনের সর্বাপেক্ষা কঠিনতম চরিত্রে তিনি। কেন কঠিনতম?এই প্রশ্নের উত্তরে দেব জানিয়েছিলেন, একমুখী নয় যে মানুষটার চরিত্রে অভিনয় করছি তিনি বহুমুখী। অর্থাৎ মাল্টি ডায়মেনশনের একজন মানুষ। 

সত্যি বলেছেন দেব। বাবা ফ্যাকাল্টি অফ মেডিসিনের প্রথম বাঙালি ডিন ছিলেন,ভাই ভারতের প্রথম টেনিস চ্যাম্পিয়ন, যার এক দাদা ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড এবং ওয়েল্‌সের মের্সনিক লজের সর্বোচ্চ সম্মানপ্রাপ্ত প্রথম ভারতীয়, অন্য দাদা 
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নন-অফিসিয়াল উপাচার্য, নগেন্দ্রপ্রসাদ নিজে প্রেসিডেন্সির কৃতি ছাত্র।তিনি ইংরেজি ও সংস্কৃত ভাষায় দক্ষ ছিলেন। তিনি কবি, সাহিত্যরসিক, নাট্যকার এবং নাট্যসমালোচক ছিলেন। তিনি শেক্সপিয়ারের টেম্পেস্ট এবং মার্চেন্ট অফ ভেনিস অনুবাদ করেছিলেন। হিন্দুধর্মশাস্ত্র এবং তন্ত্রশাস্ত্রে তার গভীর জ্ঞান ছিল। তিনি কীর্তন গানেও দক্ষ ছিলেন, পাশাপাশি ফুটবল, রাগবি, ক্রিকেট, হকি খেলা বাঙালিদের মধ্যে শুধু প্রতিষ্ঠাই নয়, শোভাবাজার ক্লাব সহ বয়েজ ক্লাব, ফ্রেন্ডস ক্লাব, হাওড়া স্পোর্টিং ক্লাব, প্রেসিডেন্সি ক্লাব প্রতিষ্ঠা করে দাপটের সঙ্গে ব্রিটিশদের সঙ্গে পাল্লা দিয়েছেন। বিশাল এক সামাজিক আন্দোলন বলা যায়। স্বাধীনতার অন্য এক যুদ্ধ।
এত বড় ক্যানভাসের মানুষকে ধরা সহজ কাজ ছিল না। ধ্রুব এবং ওর রিসার্চ টিম দুর্দান্ত কাজ করেছে। গবেষণা সঠিক হলে অভিনয়ের সুবিধা হয়। প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়েছে, যতটা ফিজিক্যাল, তার দশগুন মানসিক।  

এসবিএফ সাহসের সঙ্গে এই প্রজেক্ট এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে, বাংলা ছবির জন্য যেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সর্বভারতীয় ছবিতে বায়োপিক যথেষ্ট সাফল্য পাচ্ছে, বাংলায় সেভাবে বায়োপিক হয় না, এটা বাঙালি দর্শকদের একটা আক্ষেপ ছিল। এবার সেটা মিটে যাবে। 
এই প্রসঙ্গে পরিচালক ধ্রুব বন্দ্যোপাধ্যায় এই প্রতিবেদককে জানিয়েছিলেন,তিনি তো যুগপুরুষ। কিন্তু ফুটবল পাগল এই জাতিটা মানুষটাকে ভুলে গিয়েছি, কী অদ্ভুত বিস্মৃতি।১৮৯২ খ্রিষ্টাব্দে শোভাবাজার ক্লাব তাঁর নেতৃত্বে সমস্ত ইউরোপীয় ক্লাবকে পরাজিত করে ফ্রেন্ডস কাপ জয় করে। সেই বছরই আই.এফ.এ শিল্ড খেলা হয়। ১৮৭৭ থেকে ‌১৯০২ খ্রিষ্টাব্দ অবধি তিনি ৭০০-র বেশি ম্যাচ খেলেছিলেন। এই মানুষটা একটা গণ আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন। বলা যেতে পারে ক্রীড়া ও সামাজিক ক্ষেত্রে এটাও একটা রেনেসাঁ।
প্রযোজক এসবিএফ সঠিক লোকের হাতেই ছবির দায়িত্ব দিয়েছে। গুপ্তধন সিরিজে ধ্রুব দেখিয়ে দিয়েছে স্ট্রিমলাইন স্টোরিকে কি মশলায় অমন সিনেমাটিক করে তোলা যায়। অভিযান, থ্রিল, রোমান্স আর কমেডিকে যে দুর্দান্ত মুন্সিয়ানায় মিশিয়েছেন, তা শুধু বাণিজ্যিক ভাবেই সফল নয়,সেই সঙ্গে বাংলা বর্তমান চলচিত্রে এক নতুন ঘরানা প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে। টিম গড়ে রিসার্চের দায়িত্ত্ব সঁপে দেওয়া নয়, ব্যক্তিগত সম্পর্ক থেকে দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি, এই গবেষণাটা ও নিজের আগ্রহে করে। শিক্ষিত মানুষ, নিজে আন্তর্জাতিক কর্পোরেটে দীর্ঘদিন দায়িত্ব সামলে এসেছেন, বিষয়ের গভীরে গিয়ে কাজ করা ওর নেচার। নগেন্দ্রপ্রসাদ এর বিপুল বৈচিত্রময় জীবনের থেকে মনিমুক্ত খুঁজে আনতে পারবে। সত্যিই তো ভারতীয় ফুটবলের জনক নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারী। বাঙালির ‘ফুটবল প্রিয়’ তকমাটা যে মানুষটার জন্য শুরু হল, তিনিই ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে গিয়েছেন। ছবিতে শোভাবাজারের রাণি এবং নগেন্দ্রপ্রসাদের স্ত্রী কমলিনীর ভূমিকায় ঈশা সাহা। কমলিনীই ছিলেন নগেন্দ্রপ্রসাদের জোর, যিনি সবসময় তাঁর পাশে ছিলেন। এই ছবির আরও একটি চমক সূর্য কুমার সর্বাধিকারী ওরফে দেবের বাবার ভূমিকায় শ্রীকান্ত আচার্য। প্রসন্ন কুমার সর্বাধিকারীর চরিত্রে থাকছেন পরিচালক-অভিনেতা জয়দীপ মুখোপাধ্যায়। বিপ্লবী ভার্গভ এর চরিত্রে অনির্বান, আছেন ইন্দ্রাশিষ, জন ভট্টাচার্য, জয়দীপ মুখার্জি, পদ্মনাভ দাশগুপ্ত, ইন্দ্রজিৎ মজুমদার ও তুলিকা বসু। ছবিতে মেজর ফ্রেডরিকের চরিত্রে জনপ্রিয় মার্কিন অভিনেতা আলেক্স ও নিল আছেন। চিটাগং, চিনি কম, গ্যাং স্টার, রুহী, চেহেরে ছবির অভিনেতা আলেক্স ভারতীয় ছবিতে পরিচিত নাম। দ্বিভাষিক এই ছবিটি ১০ অক্টোবর সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে মুক্তি পাচ্ছে। 

Advertisement

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here