কমঃ প্রমােদ দাশগুপ্তর নির্দেশে
রবীন্দ্রসদনে রাখা গেল না উত্তমের মরদেহ
রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে মালাও দেওয়া হয়নি

0

Last Updated on November 16, 2020 10:58 PM by Khabar365Din

কথাকলি দত্ত

- Advertisement -

প্রথমেই বলে রাখা দরকার, এই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তার মন্ত্রিত্বের কেরিয়ার শুরু করেছেন ১৯৭৭ সালে তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী হিসেবে। সারা দেশের সাধারণ নিয়মটা আলাদা। সারা দেশের প্রধানমন্ত্রী বা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর পজিশনের ঠিক পরেই থাকেন অর্থমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, যাকে বলে সেকেন্ড ইন কমান্ড। অর্থাৎ কোনও কারণে প্রধানমন্ত্রী বা রাজ্যের ক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রী হঠাৎ অপসারিত বা প্রয়াত হলে সেকেন্ড ইন কমান্ড তার জায়গায় অভিষিক্ত হন। সারা দেশ যেভাবে চলে পশ্চিমবঙ্গ সেভাবে নয়। যেমন দপ্তরটার নামও তথ্য ও সংস্কৃতি ছিল না। সংস্কৃতি শব্দটি যােগ করা হয়েছে। স্তালিনপন্থী কমিউনিস্ট সরকার ক্ষমতা দখল করেছে। অতএব সরকার সংস্কৃতিতে যে খবরদারি করবে , এটা প্রথমেই বুঝিয়ে দেওয়া হয়। তাছাড়া এও ঠিক যেহেতু বুদ্ধদেব । ভট্টাচার্য মহাশয় হলেন সংস্কৃতি মনস্ক সিপিএম। অতএব পার্টির পক্ষ থেকে এই খবরদারির দায়িত্ব ওঁকেই দেওয়া হল (এসব কালচারাল ব্যাপার। বুদ্ধকে জিজ্ঞেস করুন। ওই ভাল বুঝবে, জ্যোতি বসু। স্থান নন্দন। সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে ‘সুকুমার রায়’ তথ্যচিত্র দেখার পর)। এই প্রসঙ্গে মনে রাখতে হবে, আমরা সকলেই জেনেছি বা জানতে বাধ্য হয়েছি যে, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মহাশয় ঠিক কবি সুকান্ত বা উৎপল দত্ত’র নাটক দেখে বেড়ানাে সিপিএম নন, উনি জীবনানন্দ ও সত্যজিৎপন্থী। অর্থাৎ এরকম একটা ভ্রান্তিও আমাদের মধ্যে তৈরি করে দেওয়া হল যে উনি সংস্কৃতির ক্ষেত্রে কতকটা উদারপন্থী। প্রসঙ্গত এও জেনে রাখা দরকার সারা পৃথিবীতে পশ্চিমবঙ্গ নামক রাজ্যটি ছাড়া আর একটি দেশের সরকারেই সংস্কৃতি বিষয়ক একটি দফতর আছে, তা ফ্রান্স চীনে থাকতে পারে, বলতে পারব না, চীনে আদৌ কোনও সংস্কৃতি আছে কিনা – সে ব্যাপারেই যথেষ্ট সন্দেহ আছে। এটি ভূমিকা মাত্র। এবার আসা যাক মূল বিষেয়। মূল বিষয়টি বােঝার জন্য অবশ্য এই ভূমিকাটির প্রয়ােজন ছিল। আসুন, এবার আমরা ২৭ জুলাই, ১৯৮০ সকাল থেকে কী কী ঘটেছিল একবার দেখে নিই।

১৯৮০ সালের ২৭ জুলাই। উত্তম কুমারের পরের দিন সকাল ভােরের আলাে ফোটামাত্র দুটি ঘটনা ঘটে। প্রথমত, খবরের কাগজে খবর দেখে ওই ভােরেই কয়েক হাজার মানুষের ভিড় জমে যায় ভবানীপুরে। দ্বিতীয়ত, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় মরদেহের পাশে এসে বসেন। শেষ কাজ পর্যন্ত সৌমিত্র উত্তমকুমারের মরদেহের পাশ থেকে নড়েননি। কোন আমরা-ওরা’র রাজনীতি এক মুহূর্তের জন্যও টলাতে পারেনি। আর ছিলেন শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়। ভিড় বাড়ছে দেখে সকলে মিলেই সিদ্ধান্ত নিলেন, রাজ্য সরকারের সঙ্গে একবার কথা বলা যায় কি, যদি রবীন্দ্রসদনে মরদেহ রাখা যায় তা হলে বাংলার মানুষ একবার শেষ দেখাটা দেখতে পাবে। তরুণকুমার নিজেই দায়িত্ব নিলেন। তথ্য সচিবের সঙ্গে যােগাযােগ করে পরিবারের পক্ষে আবেদন করা হল। তিনি জানালেন, মন্ত্রীর মতটা জেনে পরিবারকে জানানাে হবে। আধ ঘন্টার মধ্যে উত্তর এল। সরকারি মত হল, বামফ্রন্ট সরকার টালিগঞ্জের কমার্শিয়াল ছবির কোনও হিরাের মরদেহ। রবীন্দ্রসদনে রাখতে পারবেন না।

দুপুর ১১.৪০। ২৫ জুলাই ১৯৮০৷ উত্তমকুমার সম্পর্কে বামফ্রন্ট সরকারের ভারডিক্ট। এই ঘটনার ঠিক ২৭ বছর পর, মলত লিটল ম্যাগাজিনের আদ্যন্ত প্রতিষ্ঠান বিরােধী লেখক সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় রবীন্দ্রসদনে শায়িত। ওই অঞ্চলে ঘুরতে আসা একজন আলটপকা প্রশ্ন করে বসে, আচ্ছা এই ভদ্রলােক কে? কী করতেন? কখনও নাম শুনিনি তাে। উপস্থিত এক রাগী যুবক বেশ অ্যাডামেন্টলি উত্তর দিলেন, “উনি একজন লেখক, আধুনিক লেখক, তা ছাড়া উনি চিফ মিনিস্টারের বন্ধু খুবই বন্ধু। তাে এই বন্ধুকৃত্যটিও মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের পক্ষে সম্ভব হত না; যদি কমরেড প্রমােদ দাশগুপ্ত বেঁচে থাকতেন।

১৯৮০ সালের ২৫ জুলাই কমরেড প্রমােদ দাশগুপ্ত, বাংলার স্তালিন, কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া, মার্কসবাদীর রাজ্য সম্পাদক ও পলিটব্যুরাের সবচেয়ে ভােকাল সদস্য আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে বসে মুখ থেকে চুরুট নামিয়ে একঘর ধোঁয়া ছেড়ে বলেন, “আমাদের গভর্নমেন্ট শেষ পর্যন্ত কি কোনও টালিগঞ্জের ম্যাটিনি আইডলের ফিউনারেলে নিজেকে অ্যাসােসিয়েট করছে? প্রােপােজালটা আনলেন কে? পিডিজি’র পাশে বসে ছিলেন কমরেড কৃষ্ণপদ ঘােষ। তিনি মুচকি হাসেন। পিডিজি যখন এসব বলছেন তখন ভবানীপুরের বাড়ির সামনে ট্রাকের উপর শুইয়ে দেওয়া হয়েছে উত্তমকুমারের মরদেহ। চারপাশের সবকটি রাস্তায় প্রায় মাইলখানেক জুড়ে মানুষের ভিড়। তারা কাঁদছে। হাউহাউ করে কাঁদছে। এই ক্রন্দনরত জনসমুদ্র সামলাতে পুলিশ কমিশনার থেকে শুরু করে গােটা লালবাজার রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছিল।

দুপুর ২.৩০। স্বল্পাহারী কমরেড প্রমােদ দাশগুপ্ত দুপুরের যৎসামান্য মধ্যাহ্নভােজ সেরে নিবন্ত চুরুটে অগ্নিসংযােগ করে বলেন, বুদ্ধকে বােললা, ঠিকই ডিসিশন নিয়েছে। তবে জ্যোতিবাবু বলছিলেন, একটা রিথ পাঠানোের কথা। সেটা পাঠানাে যেতেই পারে। আই হ্যাভ নাে অবজেকশন। প্রমােদ দাশগুপ্ত মহাশয়-সহ ওই ঘরে আর যাঁরা ছিলেন, সকলেই আজ প্রয়াত। এই কথাবার্তাগুলাে আমায় বলেছিলেন ১৯৯৬ সালে আলিমুদ্দিনে বসে পার্টির এক সর্বময় কর্তা, যাঁর নাম আমি বলব না।

Advertisement

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here