আজও একাই ১০০

0

Last Updated on September 30, 2021 11:06 PM by Khabar365Din

সুপারস্টার ইমেজের খাঁচায় আটকে না থেকে বারবার অর্থবহ চরিত্রে অভিনয় করাটা এদেশে অমিতাভ বচ্চন ছাড়া আর কেউ সাহস পাননি

- Advertisement -

শুধু নিজেকেই বদলাননি,

বাংলা ইন্ডাস্ট্রিকেও বাঁচিয়ে রেখেছেন


৩৬৫ দিন। সৌগত সরকার। গুগুল প্রসেনজিৎ চট্টপাধ্যায়ের জন্মদিনকে একটা সংখ্যায় দেখিয়েছে। শুধু সংখ্যার মধ্যে রেখে দেওয়া প্রতিটি জন্মদিন তিনি নিজের মত করেই পালন করে আসছেন। ব্যক্তিগত কিংবা পেশাদার জীবনেও সেই পরিশীলতার গণ্ডী অতিক্রম করেননি তিনি। বাংলা চলচিত্র জগৎ তাঁকে উত্তমকুমার পরবর্তী মহানায়কের আসনে বসিয়েছে, শুধু বিগত ৪০ বছর ধরে ব্যাংলা চলচিত্রকে শাসন করার জন্য নয়, সাড়ে তিনশোরও বেশি ছবি, একাধিক জাতীয় পুরস্কার, ডজন খানেক সম্মানের জন্য নয়। আরও বড় ব্যাপ্তির জন্য তিনি বাংলা চলচিত্রের মহানায়ককে মর্যাদা আদায় করেছেন। 

গৌতম ঘোষের মনের মানুষ ছবিতে লালন ফকির।

১৯৮০ থেকে ২০২১ তাঁর দীর্ঘ এই যাত্রায় তিনবার গুরুত্বপূর্ণ বদল এনেছেন। যার প্রতিটা পর্যায় ব্যাংলা চলচিত্র এবং বাংলা চলচিত্রের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের বাঁচার, এগিয়ে চলার ইন্ধন জুগিয়ে গিয়েছে। ইন্ডাস্ট্রিকে এই জ্বালানিটা তিনি নিরন্তর জুগিয়ে গিয়েছেন। অভিভাবকের মত হাত ধরে রাস্তা পার করছেন। মহানায়কোচিত এই অধ্যায় বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য অতিতে কেউ করেছে বলে মনে পড়ে না। হৃষিকেশ মুখার্জির ছোট্ট জিজ্ঞাসা, ছবির কথা বলছি না, কারণ তিনি ছিলেন শিশু শিল্পী মাত্র।১৯৮০ তে পীযুষ বসুর দুটি পাতা দিয়ে যাত্রা শুরু। সবে প্রয়াত হয়েছেন উত্তমকুমার।সৌমিত্র,শুভেন্দুরা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন ইন্ডাস্ট্রিকে বাঁচাতে। চরম শূন্যতায় তরুণ মজুমদারের হাত ধরে দাদার কীর্তি করে ফেলেছেন।

২০১৮। লোকেশন নভোটেল। ফটোশ্যুট গোপাল রাও। @ খবর ৩৬৫ দিন।

পরপর সাহেব, ভালোবাসা ভালোবাসা হিট। সুখেন দাস, সুজিত গুহ কিংবা অঞ্জন চৌধুরীর সঙ্গে প্রসেনজিৎ তখন লড়াই করছেন। প্রতিশোধ, জীবন মরণ, দাদামনি, শত্রু ছবিতে তাঁর কাজ দর্শকদের পছন্দ হল। ১৯৮৬ র পর থেকে বাজি ঘুরতে শুরু করল। ১৯৮৭ গুরুদক্ষিণায় বড় হিট পেলেন তাপস। কিন্তু প্রসেনজিৎ তাঁর ননস্টপ পারফরম্যান্স দিয়ে চললেন ধারাবাহিক ভাবে। ১৯৮৬ থেকে ৯০ র মধ্যে অন্তত ৭০ টা ছবি, যা ইন্ডাস্ট্রিকে, এর সঙ্গে যুক্ত মানুষদের বাঁচিযে রাখল।

ঋতুপর্ণ ঘোষের চোখের বালি ছবিতে মহেন্দ্র।

হিন্দি ছবিতে তখন অনিল কাপুর, সঞ্জয় দত্ত,শাহরুখ, আমির, সলমন, গোবিন্দাদের ঝড় উঠেছে। বাংলা ছবি থেকে মুখ ফিরিয়েছে তরুণ প্রজন্ম। পুরানোরা তখনও স্বর্ণ যুগের ঘি চেটে চলেছেন। আহা কি ছবি ছিল আমাদের সময়ে! কিন্তু ইন্ডাস্ট্রিকে টেনে চলেছিলেন প্রসেনজিৎ। সঙ্গে তাপস ও চিরঞ্জিত। পথভোলা, প্রেমবন্ধন, সম্রাট ও সুন্দরীর পর অমর প্রেম। ঘুরে গেল ইন্ডাস্ট্রির অভিমুখ। আমার তুমি, মনে মনে, আপন আমার আপন সব সব ছবি সারা বাংলা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রায় হাজার সিঙ্গল স্ক্রিন দাপিয়ে বেড়ালো। হিন্দি ছবির তুফান কিছুটা হলেও আটকে গেল বাংলায় এসে। 
নয়ের দশকে এসে এই অভিমুখ পুরোটাই ঘুরিয়ে দিলেন প্রসেনজিৎ। কথা দিলাম, এক পশলা বৃষ্টি, আপন পর, শয়তান, অধিকার, পুরুষোত্তম, মন মনে না, তুমি যে আমার, ধূসর গোধূলি হিন্দির সঙ্গে লড়াইটা সমানে সমানে করে দিল।

সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের জাতিশ্বর ছবিতে অ্যান্টনি কবিয়াল/কুশল হাজরা।

এই দশকে অন্তত ১০০ ছবি খেলার মোড় ঘুরিয়ে দিল। এবার দরকার ছিল পরিবর্তনের। হিন্দি সহ গোটা বিশ্বে বিনোদনের ভাষা দ্রুত বদলে য যাচ্ছিল। ঋতুপর্ণ এলেন নতুন ছবির ভাষা নিয়ে। উনিশে এপ্রিল সেই পরিবর্তনের প্রথম সফল ধাপ। একই সঙ্গে তখন প্রসেনজিৎকে কঠিন সিধান্ত নিতে হত। একদিকে অন্যধারার সিনেমা অন্যদিকে চিরাচরিত বাণিজ্যিক মশলা ছবি। কোনটা বাঁছবেন তিনি? তিনি নিজেই সিধান্ত নিলেন। একই সঙ্গে অন্য ধারার ছবির রিস্ক নেবেন, পাশাপাশি ব্যাংলা ইন্ডাস্ট্রিকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। এমন সময় গিয়েছে যখন উনিশে এপ্রিল চলছে প্রিয়াতে আর বসুশ্রীতে চলেছে প্রভাত রায়ের লাঠি। দুটোই হিট। দর্শককে দু ভাগে ভেঙে দিতে সক্ষম হলেন প্রসেনজিৎ। একদিকে স্বপন সাহা, সুজিত গুহ, অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যয়ের হিট ছবি অন্যদিকে হরনাথ, প্রভাত রায়, ঋতুপর্ণর ভিন্ন স্বাদের ছবি।

কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের কিশোর কুমার জুনিয়র ছবিতে রজত ঘোষ।


শূন্য দশকে এসে চিত্রটা পাল্টে গেল। ব্যাংলা ইন্ডাস্ট্রি আবার নিজের মত করে জ্বালানি সংগ্রহ করে নিয়েছে। এবার প্রসেনজিৎ নিজেকে ভাঙতে শুরু করলেন। ঋতুপর্ণর উৎসব সেই ভাঙার শুরু। ডাউন দা লাইন অভিনয়। নিচু তারে বাধা অভিনয়। দোসর, সব চরিত্র কাল্পনিক, হরনাথ এর রিফিউজি, চল পাল্টাই,বুদ্ধদেব দাসগুপ্তর স্বপ্নের দিন, পাশাপাশি রবি কিনাগি, সুজিত গুহদের সঙ্গেও চলছিল কাজ। এর পরে এল বড় ধাক্কা। সাড়ে তিন মাস মাটিতে শুয়ে, নিরামিষ খেয়ে, বাউল সংগ করে নিজেকে অভিনেতার পরিপূর্ণতার দিকে নিঃশব্দে নিয়ে যাচ্ছিলেন প্রসেনজিৎ। মুক্তি পেল গৌতম ঘোষের মনের মানুষ। ইন্ডাস্ট্রি বুঝে গেল মহানায়ক থেকে মহা অভিনেতা হয়ে ওঠার নতুন যাত্রা শুরু করেছেন তিনি। সৃজিত মুখার্জির প্রথম ছবি অটোগ্রাফ, ঋতুপর্ণর নৌকাডুবি, চোখের বালি, কেবল জাতীয় পুরস্কার নয়, বাংলা চলচ্চিত্রের এক নতুন দিক উন্মোচন করে দিলেন প্রসেনজিৎ।

গৌতম ঘোষের শঙ্খচিল ছবিতে মুন্তাসির চৌধুরী বাদল।

বাইশে শ্রাবণ থেকে জাতিশ্বর, গৌতম ঘোষের শঙ্খচিল থেকে কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের কিশোর কুমার জুনিয়র, জেষ্ঠপুত্র থেকে গুমনামি এই যাত্রা ও অবলীলায় গ্রাম ও শহর দুই দর্শককুলকে এক ছাতার তলে নিয়ে এসেছে। হয়ত সময় লেগেছে ২০ বছর। কিন্তু বাংলা চলচিত্রকে একা তিনিই নতুন সিনেমার ইন্ধন জুগিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছেন। জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে গ্রাম বাংলার পোসেনজিত কিন্তু আল্টিমেটলি সব দর্শককে স্ট্রিম লাইনে এনে ফেলেছেন। আজ ক্ষত কিংবা ময়ূরাক্ষীর মত ছবি গ্রাম বাংলাতেও মুক্তি পেতে ভয় পায় না। কারণ প্রসেনজিৎ এই ৩৫ বছরে সাগরকে (অমর প্রেম) কুশল হাজরাতে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন।

Advertisement

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here