Kerala Story: ‘কাশ্মীর ফাইলস’র মতো আজগুবি, মুসলিমদের বিরুদ্ধে হেট স্পিচ

0

Last Updated on May 7, 2023 7:20 PM by Khabar365Din

“দ্য কেরালা স্টোরি”র মূল নীতিবাক্য – “মুসলিম মানেই জঙ্গি – হিন্দুরা, মুসলিম হঠাও”

৩৬৫ দিন। পুরো কেরালা সুইসাইড বোম্বারের ওপরে বসে রয়েছে। যেকোনো সময় কেরালা ধ্বংস হয়ে যাবে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে গোটা কেরালার হিন্দুদের ধর্মান্তর করে মুসলমান বানিয়ে দেওয়া হবে। এমন জোরালো ডায়লগ কোন হিন্দুত্ববাদী বা উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের নেতার বক্তব্য বা ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপে হেট স্পিচের অংশ নয় – বাঙালি পরিচালক সুদীপ্ত সেনের নতুন ছবি দ্য কেরালা স্টোরিতে এমন জোরালো বক্তব্যই রাখার চেষ্টা করা হয়েছে গোটা সময়টা জুড়ে। দ্য কেরালা স্টোরি। শাহরুখ খান অথবা সলমান খানের মতো বড় মাপের কোন নায়ক না থাকা সত্ত্বেও অথবা বলিউডের প্রথম সারির কোন পরিচালক বা প্রযোজক এই ছবির পিছনে না থাকলেও হঠাৎ করেই গোটা দেশের সংবাদের শিরোনামে চলে এসেছে ছবিটি।

হাইকোর্ট থেকে সুপ্রিমকোর্ট একের পর এক মামলা এমনকি তার থেকেও বেশি করে আগামী সপ্তাহে কর্ণাটক বিধানসভার নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে পর্যন্ত খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই ছবির প্রচারে যতটা সময় দিচ্ছেন ততটা সময় দলের ম্যানিফেস্টো প্রচারে দিচ্ছেন না। তার মধ্যে আবার মধ্যপ্রদেশের ভাজপা শাসিত সরকার এই ছবিকে করমুক্ত ঘোষণা করেছে। মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিংহ চৌহান এই ছবিকে করমুক্ত ঘোষণা করে দাবি করেছেন, সন্ত্রাসবাদের ভয়ঙ্কর সত্যকে সামনে এনেছে দ্য কেরালা স্টোরি ছবিটি। এই ছবি সকলের দেখা উচিত। বিভিন্ন রাজ্যের ভাজপা সাংসদ এবং বিধায়করা নাকি বাস ভাড়া করে দলের নেতাদের এই সিনেমা দেখাতে নিয়ে যাচ্ছেন। তাই স্বাভাবিকভাবেই বিতর্কের পাশাপাশি কৌতুহল তৈরি হয়েছে ছবিটি ঘিরে। গোটা ছবিতে কলাকুশলীদের মধ্যে পরিচিত মুখ বলতে মোটামুটি পরিচিত অভিনেত্রী আদা শর্মা। দ্য কেরালা স্টোরি-র প্রযোজক বিপুল শাহ এবং পরিচালক সুদীপ্ত সেনের নামও খুব একটা বেশি লোকের জানা নেই।

কি রয়েছে কেরালা স্টোরি ছবিতে

এই ছবি কেরলের এক হিন্দু মেয়ের গল্প বলে, যাকে তার মুসলমান বান্ধবী কথা-ব্যবহারের প্যাঁচে ফেলে ধর্মান্তরিত করে। এরপর তাকে আইসিস সন্ত্রাসী সংগঠনে পাঠিয়ে দেওয়া হয় সিরিয়াতে। সুদীপ্ত সেন পরিচালিত এই ছবির নির্মাতাদের দাবি, এই ছবির গল্প সত্য ঘটনা অবলম্বনে তৈরি, যেখানে কেরলের প্রায় ৩২ হাজার মহিলাকে ফাঁদে ফেলে সন্ত্রাসের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। যদিও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক প্রত্যেক বছর যে এনসিআরবি ডাটা প্রকাশ করে, তার কোথাও এই দাবির কাছাকাছি কোন তথ্য পাওয়া যায় না। অথচ গোটা ছবি জুড়ে দীর্ঘকাল ধরে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএসের হিন্দু মেয়েদের ধর্মান্তর করে মুসলিম বানিয়ে সন্ত্রাসবাদি সংগঠনে ভেড়ানোর তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করার জন্য যা মনে চেয়েছে তাই দেখিয়ে দিয়েছেন পরিচালক।

তার জন্য লাভ জিহাদ অর্থাৎ হিন্দু মেয়ের সঙ্গে মুসলিম ছেলের প্রেম এবং তারপরে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্মান্তর করে মুসলিম জনসংখ্যা বাড়ানো, কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রথম সারির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলির হোস্টেলে শহুরে মাওবাদী এবং দেশবিরোধীদের আখড়া প্রমাণ করা, যত সমাজ বিরোধী এবং যত অকাজ-কুকাজ সবকিছুর পিছনে শুধুমাত্র মুসলিমরা, ভাজপা যে রাজ্যে ক্ষমতায় নেই সেখানকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বলে কিছু নেই – এমন বেশ কিছু তথ্য যেন দর্শকের মাথায় হাতুড়ি মেরে মেরে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে ২ ঘণ্টা ১৮ মিনিটের এই ছবিতে। ২০২৩ সালে দাঁড়িয়ে একটি রাজ্যের রাজধানী শহরের শপিং মলে তিনটি মেয়ের জামা কাপড় ছিড়ে তাদেরকে প্রকাশ্যে কয়েকশো মানুষের সামনে মারধর করছে কয়েকটি যুবক শুধুমাত্র তারা নাকি হিজাব বা বোরখা পরে নি বলে। অথচ কি আশ্চর্য সাধারণ লোকের মধ্যে থেকে কেউ সাহায্য করতে আসা দূরের কথা ঘটনার পরে মাসের পর মাস কেটে গেলেও নাকি পুলিশ বা মল কর্তৃপক্ষ কোন ব্যবস্থাই নেয় না। গোটা শহর অথবা কলেজ কোথাও কোনো সিসিটিভি ক্যামেরার অস্তিত্ব নেই। এমন অসংখ্য বিষয় কার্যত জোর করে দেখিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে গোটা সিনেমাতে।

কেন এত মরিয়া চেষ্টা

কর্ণাটক বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে গিয়ে খোদে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই ছবির সম্পর্কে যে প্রচার করেছেন তা থেকেই স্পষ্ট কেন এই ছবির পরিচালক এবং নির্মাতারা মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালিয়েছেন বিশেষ বিশেষ কয়েকটি তত্ত্বকে দাঁড় করানোর জন্য। প্রসঙ্গত ভুলে গেলে চলবে না গোটা দেশের মধ্যে একমাত্র কর্নাটকের ভাজপা সরকার হিজাব নিষিদ্ধ করেছিল মুসলিম মহিলাদের জন্য। সেই কর্নাটকেই ভোট আগামী সপ্তাহে। নরেন্দ্র মোদি এই ছবি সম্পর্কে বলেন, দ্য কেরালা স্টোরি ছবিটি সমাজের ভিতরে জমে থাকা সন্ত্রাসবাদের মুখোশকে প্রকাশ্যে তুলে ধরবে। কেরলের মতো একটা সুন্দর জায়গা, সেখানকার লোকজন এত বুদ্ধিমান, মেধাবী, সেখানে এই ধরনের সন্ত্রাসবাদ সমাজের চূড়ান্ত ক্ষতি করছে বলেই আমার বিশ্বাস। কংগ্রেস পার্টি এই একটা ছবিকে নিষিদ্ধ করতে উঠে পড়ে লেগেছে। সবার এই ছবিটি দেখা উচিত।

ছত্রে ছত্রে ইসলামোফোবিয়া

কেরালা স্টোরি ছবিটি দেখতে গিয়ে যত না ছবির মূল অভিনেত্রী আদাশোরমার নিষ্পাপ মুখ মানুষের মধ্যে প্রভাব বা সহমর্মিতার আজ ফেলবে তার থেকে বেশি যেন প্রতি সেকেন্ডে তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে ইসলামোফোবিয়া। অর্থাৎ মুসলিম মেয়ে বা বান্ধবী মানেই সে সন্ত্রাসবাদীদের গুপ্তচর এবং মুসলিম ছেলে মানেই। সে প্রতি মুহূর্তে চেষ্টা করছে কোন হিন্দু মেয়েকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে প্রয়োজনে প্রেগনেন্ট করে তার ধর্ম পরিবর্তন করার। যার চূড়ান্ত লক্ষ্য গোটা পৃথিবীকে মুসলিম শাসিত পৃথিবী বানানোর জন্য সন্ত্রাসবাদীর সংখ্যা বাড়ানো। প্রতি সেকেন্ডে এই ইসলামোফোবিয়া ছবিটি সম্পর্কে আগ্রহের পরিবর্তে তৈরি করে বিরক্তি।

মার্কিন প্রোপাগান্ডার ছবি

তবে এই ছবি যে বিশেষ রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় প্রোপাগান্ডা পূরণের জন্যেই বানানো হয়েছে। দেখার পরে তা নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকার কথা নয়। সত্তরের দশকে এবং ৯০ এর দশকের একেবারে প্রথম দিকে প্রথমে ভিয়েতনাম যুদ্ধ এবং পরে সোভিয়েত বনাম আফগান যুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হলিউডের কয়েকটি প্রোডাকশন হাউসকে টাকা দিয়ে সি আই এর গুপ্তচরদের মাধ্যমে তৈরি করেছিল বেশকিছু প্রোপাগান্ডা ছবির সিরিজ। যার মধ্যে একেবারে প্রথম সারিতে রয়েছে সিলভেস্টার স্ট্যালোনের রামবো, পরে ক্যাপ্টেন আমেরিকা সিরিজ এমনকি একেবারে হাল আমলে লাদেনকে হত্যার গল্প নিয়ে তৈরি জিরো ডার্ক থার্টি পর্যন্ত। মার্কিন গুপ্তচর সংস্থার সিআইএ ইসরাইলের ছবি নির্মাতা গোলান ও গ্লোবাসকে সামনে রেখে বানিয়ে গিয়েছে একের পর এক প্রোপাগান্ডামূলক ছবি। যার মূল কথা ছিল ভিয়েতনাম অথবা রাশিয়া সর্বত্র শুধু শয়তান বাস করে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেখানে ভগবানের দূত হয়ে সাধারণ মানুষের উদ্ধারে যাচ্ছে। বিশেষ করে যখন ভিয়েতনাম যুদ্ধে লক্ষ লক্ষ মার্কিন সৈনিক নিহত হওয়ার খবরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেঁপে উঠেছিল সেই সময় এই সমস্ত ছবি মার্কিন মুলুকে করমুক্ত করে দেখানোর ব্যবস্থা হয়েছিল সরকারি উদ্যোগে।

ক্রোনোলজি

দ্য অ্যাক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার। ভারতে মুক্তি পেয়েছিল 2019 সালের লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগে জানুয়ারি মাসে। ২০২২ সালের মার্চ মাসে ভারতজুড়ে মুক্তি পায় দ্য কাশ্মীর ফাইলস। সময়ের হিসেবে গুজরাত হিমাচল বিধানসভা নির্বাচনের মাস কয়েক আগে। এবারে গত ৫ মে বহু বিতর্ক তৈরি করে দেশজুড়ে মুক্তি পেয়েছে দ্য কেরালা স্টোরি। কি অদ্ভুত তাৎপর্যপূর্ণ সমাপতন। কারণ সামনেই রয়েছে কর্ণাটক বিধানসভার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন এবং তারপরেই আগামী বছরের শুরুতেই দেশে লোকসভা নির্বাচন। আদতে এই সিনেমাগুলির সঙ্গে সরাসরি রাজনীতি বা বিধানসভা ও লোকসভা নির্বাচনের কোন সম্পর্ক থাকার কথা নয়। কিন্তু ও অধুনা ভারতীয় রাজনীতিতে ভীষণ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠা ক্রোনোলজি শব্দটি যেন এই সিনেমাগুলোর সঙ্গে অদ্ভুতভাবে জড়িয়ে গিয়েছে। প্রত্যেকটি ছবি বিশেষ করে কাশ্মীর ফাইলস এবং কেরালা স্টোরি সরাসরি ভোটের রাজনীতিকে প্রভাবিত করার জন্য এবং ধর্মীয় মেরুকরণ রাজনৈতিকভাবে স্পষ্ট করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।