বিশ্বের সেরা গায়িকা লতা মঙ্গেশকর প্রয়াত

0

Last Updated on February 7, 2022 12:07 AM by Khabar365Din

জন্ম: ২৮ সেপ্টেম্বর, ১৯২১ ইন্দোর, মধ্যপ্রদেশ
প্রয়াণ: ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২২, মুম্বই

- Advertisement -

রোলিং স্টোনের মতো মার্কিন সাংস্কৃতিক দম্ভের প্রতীকও ওঁকে সেরার তালিকায় রাখতে বাধ্য হয়েছে

কথাকলি দত্ত


লক্ষ্য রেখেছিলাম কবে মার্কিনরা এই চূড়ান্ত স্বীকৃতি দেন। অবশেষে ২০১৪ সালে রোলিং স্টোন বিশ্বের সেরা গায়ক-গায়িকাদের যে তালিকা তৈরি করে তারমধ্যে রাখতে বাধ্য হন লতা মঙ্গেশকরকে (Lata Mangeshkar)। ওরা মাইকেল জ্যাকসনকে ১ নম্বর থেকে সরাতে পারেনি। আত্মসম্মানে লেগেছে। কিন্তু সত্তর দশক ধরে গান গাওয়ার ক্ষমতা ছিল নাকি মাইকেল জ্যাকসনের বেঁচে থাকলেও? বিশ্বের সেরা গায়িকা লতাই। আন্তর্জাতিক তালিকায় ২৫০ মিলিয়ন রেকর্ড বিক্রির সৌজন্যে যে ২৫ নাম সংযোজিত হয়েছে তার মধ্যে লতা আর মাইকেল জ্যাকসন ছাড়া বাকিরা হলেন বিটলস, এলভিস প্রিসলে,জন লেনন, বব ডিলান, ফ্যাঙ্ক সিনাত্রা, কিশোরকুমার, এলটন জন, ম্যাডোনা, হুইটনি হাউসস্টোন, ক্লিফ রিচার্ড ও অন্যান্য। এই তালিকায় মার্কিনী বা ব্রিটিশরা লতাকে এক নম্বরে বসালো কিনা তাতে বয়েই গেল। লতাকে তো অস্কারও (Oscar) দেওয়া হয়নি, সেটা অস্কার কমিটির লজ্জা। সঙ্গীত সম্রাজ্ঞ, বিশ্বের সেরা গায়িকার তাতে বয়েই গেল। চাঁদ সদাগরকেও শেষপর্যন্ত মনসা পুজো করতে হয়েছে, বাম হাতে করেছে যদিও তবু করতে তো হয়েছে। মার্কিন আর ব্রিটিশরা ঢোকক গিললেও স্বীকৃতি না হলেও লতা বিশ্বের সেরা গায়িকা ছিলেন, আছেন। থাকবেন কিনা ভবিষ্যৎ বলবে।

সলিল চৌধুরি বলেছিলেন
একটা হারমোনিয়াম দিন আর দিন লতাজিকে গান তৈরি হয়ে যাবে

সদাশিব রানা। মুম্বই


সলিল চৌধুরী তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, একটা হারমোনিয়াম আর লতা থাকলে যে কোনও সংগীত এমনিই সৃষ্টি হয়ে যায়। তাঁর সংগীতে আপ্লুত হয়ে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু (Jawaharlal Nehru) আবেগতাড়িত হয়ে চোখের জল সামলাতে পারেননি। সেই সুরের সাম্রাগী আর নেই। প্রয়াত লতা মঙ্গেশকর। ৯২ বছর বয়সে মুম্বইয়ের (Mumbai) ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে (Breach Candy Hospital) অবসান হল দীর্ঘ ৭০ বছরের সুর সাম্রাজ্যের। হাসপাতাল সূত্রে জানানো হয়েছে,আজ ভোরে ৮ টা নাগাদ মাল্টি অর্গ্যান ফেইলইয়োর (Multiple Organ Failure) হয় তাঁর। গত ২৮ দিন এখানেই চিকিৎসা হচ্ছিল তাঁর। ভারতরত্ন শিল্পীর মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে দেশজুড়ে। কেন্দ্রের তরফ থেকে জানানো হয়েছে দু দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হবে দেশজুড়ে।  শনিবার আচমকা তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। দিতে হয় ভেন্টিলেশনে। সেখান থেকে আর ফেরানো যায়নি লতাকে। কোভিডে (COVID-19)আক্রান্ত হওয়ায় গত ১১ জানুয়ারি তাঁকে মুম্বইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছিল। নিউমোনিয়াতেও আক্রান্ত ছিলেন নবতিপর শিল্পী। প্রথম থেকেই তাঁকে আইসিইউ(ICU) -তে রাখা হয়েছিল। ৩০ জানুয়ারি শিল্পীর কোভিড নেগেটিভ রিপোর্ট আসে। কিন্তু বয়সজনিত নানা সমস্যার কারণে শেষ পর্যন্ত আর লড়তে পারলেন না তিনি

১৯২৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর লতার জন্ম এক মারাঠি পরিবারে। মাত্র ১৩ বছর বয়সে বাবাকে হারান যদিও তার আগে বাবা দিনানাথ মঙ্গেশকর এর হাত ধরে গান শিখতে শুরু করে দিয়েছিলেন। ১৩ বছর বয়সেই প্রথম বার সিনেমায় গান গাওয়া। মরাঠি ছবিতে। মুম্বই যাওয়ার পর ১৯৪৮ সালে প্রথম হিন্দি ছবিতে গান। ‘মজবুর’ (Majboor) ছবিতে। গত ৭০ বছরে ৩৬ টি ভাষায় ৩০ হাজার গান, ২১ আঞ্চলিক ভাষায়১০ হাজার সিনেমায় গান,তাঁকে লিভিং লেজেন্ডের স্থানে প্রতিষ্ঠা করে। বাংলায় ১৮৫ টি গান গেয়েছেন। তাঁর বাবা পণ্ডিত দীনানাথ মঙ্গেশকর একজন মারাঠি ও কোঙ্কিণী সঙ্গীতজ্ঞ এবং মঞ্চ অভিনেতা ছিলেন। মাত্র ৫ বছর বয়সেই বাবার কাছে গানের তালিম শুরু করেন লতা। মাত্র ১৩ বছর বয়সে বাবাকে হারান লতা।পরিবারের ভরণপোষণের জন্য গান ও অভিনয়ে আসেন সেই বয়সেই। বাবার বন্ধু বিনায়ক দামোদর তাঁর ছত্রপতি নবযুগ প্রোডাকশন কম্পানীর ছবিতে প্রথম প্ল্যেবাক গাওয়ার সুযোগ দেন ১৩ বছরের লতাকে, সেটা ১৯৪২ সাল। যদিও ফাইনাল কাটে গানটি বাদ যায়। দুঃখ পেয়েছিলেন লতা।পরের বছর মারাঠি ছবি গাজবাবুতে তাঁর প্ল্যেবাক প্রশংসিত হয়। লতা ওস্তাদ আমন আলী খানের কাছে তালিম নেওয়া শুরু করেন। ১৯৪৫ এ মুম্বাই শহরে আসেন হিন্দি ছবিতে গান গাওয়ার জন্য। ১৯৪৬ এ সুযোগ পান আপ কি সেবা মে ছবিতে গান গাওয়ার। এবং বাদী মা ছবিতে ছোট বোন আশাকে নিয়ে অভিনয়ের সুযোগ পান। এই ছবিতে তাঁর গাওয়া ভজন প্রসংশিত হয়। পরিচালক শশধর মুখার্জি তাঁর মজবুর ছবিতে লতাকে গাওয়ার সুযোগ দেন। এই ছবিতে গাওয়া মুঝে কাহি কা না ছোড়া লতার প্রথম হিট। তা সত্ত্বেও নিজের গায়কী আমূল বদলে নিজের সিগনেচার কন্ঠকে প্রতিষ্ঠা করতে এক বছর গান গাননি লতা। পরের বছর মহল ছবিতে মেগা হিট হয় আয়েগা আয়েগা আনে ওয়ালা। দাপুটে সংগীত পরিচালকদের নজরে পড়ে এই তাঁর অসামান্য প্রতিভা। নৌসাদ, শংকর জয়কিষান, শচীন দেব বর্মন, অনিল বিশ্বাসরা তাঁকে দিয়ে প্ল্যেব্যাক শুরু করেন। দেশের মধ্যে অদ্বিতীয় সিগনেচার কন্ঠ হয়ে ওঠেন। ১৯৫০ থেকে ১৯৯০ এই দীর্ঘ সময় হেমন্ত মুখপাধ্যায়, সলিল চৌধুরী, খৈয়াম, রামচন্দ্রন, সাজিদ হোসেন,মদন মোহন, রাহুল দেব বর্মন,কল্যানজি আন্দনজী, দত্তা নায়েকের মত সংগীত পরিচালকদের সঙ্গে তাঁর সংগীত যাত্রায় ২৩ টি ভাষায় সাড়ে দশ হাজার হিট গান তাঁকে সর্বকালের সেরা ভারতীয় মহিলা সংগীত শিল্পীর স্থান করে দিয়েছে। একাদিক জাতীয় পুরস্কার, দাদা সাহেব ফালকে, দেশের সর্বোচ্চ নাগরিক সন্মান ভারতরত্ন ছাড়াও বিশ্বের অন্তত ১২ টি দেশের শ্রেষ্ঠ সম্মানে ভূষিত লতা মঙ্গেশকর আট দশক ধরে তাঁর সুরের, কণ্ঠের মায়াজালে মোহিত রেখেছেন ১৩৮ কোটি ভারতবাসীকে। ছয় প্রজন্ম ধরে একজন শিল্পীর কণ্ঠের অনুরাগী হযে থাকার ঘটনা বিশ্বে খুব বেশি নেই।  

Advertisement

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here