সেজ আর জোতদারদের এজেন্ট ঠেকাতে নন্দীগ্রামে সংগ্রহশালা কনভেনশন সেন্টার চাই

0
8073

নন্দীগ্রাম থেকে সৌগত মণ্ডল ছবি অমিত বন্দ্যোপাধ্যায়


রুশ বিপ্লবের ভিত্তিপ্রস্তর তৈরি হয়েছিল লেনিনের নেতৃত্বের আগেই। তবে তা ছিল বিক্ষিপ্ত, জার বিরােধী, ইমােশনাল, রাগী, উন্মত্ত ও অসংগঠিত। এরা বহুলাংশে নিহিলিস্ট। এরা খানিকটা প্রতিবাদ ও প্রতিরােধ গড়ে তুলছিলেন, কিন্তু আন্দোলনের রূপরেখা বা দূরদৃষ্টি কোনওটাই তাদের ছিল না। বিপ্লব কীভাবে হতে পারে, তা তাদের ধারণাতেও ছিল না। একই ঘটনা ঘটে চিনে, ভিয়েতনামে এবং আরও বেশ কিছু দেশে যেখানে পরবর্তীকালে কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে বিপ্লব হয়েছে। সেজ (এসইজেড) যে আধুনিক বানিয়াদের অতি লােভনীয় ললিপপ এবং যা আদ্যন্ত কৃষক ও শ্রমিকবিরােধী, তা নিশ্চয়ই বুঝেছিলেন, নন্দীগ্রামের ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরােধ কমিটি। বামফ্রন্ট সরকারের সিপিএম প্রশাসন এবং তাদের হার্মাদ বাহিনী যে কৌশল ব্যর্থ হলে, বলপ্রয়ােগে এবং গণহত্যা ও গণধর্ষণের মাধ্যমে জমি দখল করবেই কেন না বানিয়াদের কথা দেওয়া হয়ে গেছে, সে ব্যাপারেও নিশ্চিত ছিলেন ভূমিপূত্র কন্যারা। কিন্তু এই আন্দোলনের দিশা ছিল না। অর্থাৎ আন্দোলনকে সংহত, দিশা দেখানাে এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে শীর্ষে নিয়ে যান বাংলার অগ্নিকন্যা মমতা। লেনিন, মাও বা হাে চি মিন যা করেছেন, মমতাও একই কাজ করেছেন। বিক্ষিপ্ত আন্দোলনকে সামগ্রিকভাবে আঞ্চলিক বিপ্লবের স্তরে নিয়ে গিয়ে নিয়ে যেতে পারলেন মমতা, সংসদীয় গণতন্ত্রের পথে তৈরি হল মা মাটি মানুষের সরকার।

শহিদ পরিবার ও ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরােধ কমিটির নেতৃত্বদের সঙ্গে দফায় দফায় আলােচনা করে যা বুঝলাম, তা হল সরকার তৈরি হওয়ার পরে নেত্রী মমতা যাদেরকে প্রতিনিধি হিসেবে পাঠালেন তারা জমি সমস্যা, প্রান্তিক কৃষকের জমির অধিকারের প্রয়ােজনীয়তা এবং শােষক-শােষিতের সমস্যার প্রায় কিছুই বােঝেন না, শুধু বােঝেন না তাই নয়, সম্পর্কের গভীরে যেতেও তারা অনাগ্রহী। কারণ, প্রথমত তাদের নিজেদের সেই মেধা বা শিক্ষা নেই। দ্বিতীয়ত এরা মূলত সম্পূর্ণ বুর্জোয়া অভিজাত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। নেত্রী মমতা নিজে সম্পূর্ণভাবে বুর্জোয়া বিরােধী হওয়ায় দরিদ্র কৃষকের জমি সম্পর্কে অধিকারবােধ বুঝতে এক মিনিটও সময় লাগেনি। তিনি আন্তরিকভাবে সমস্যার গভীরে যেতে পেরেছেন এবং যে প্রতিরােধ ব্যবস্থা গড়ে তুলে দিতে পেরেছেন তা গত দশ বছর অবিচল থেকেছে। সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে মাঝের এজেন্টরা অর্থনৈতিক ভারসাম্য শিল্প ও কৃষির সমীকরণ না নিজে বুঝেছেন না নন্দীগ্রামের নবীন প্রজন্মকে বােঝাতে পেরেছে। বৎসরান্তে শহিদ বেদীতে মালা দিলেও অশিক্ষিত এজেন্টরা এজেন্টই থাকে, নেতা-নেত্রী হয়ে উঠতে পারে না। ফলে নন্দীগ্রামে উঠে আসা নবীন প্রজন্ম যারা পুরােনাে সেই ঐতিহাসিক আন্দোলন দেখেনি তারা শুধু পতাকা হাতে মিছিলে যােগ দিতে শিখেছে। জমিতে কৃষকের অধিকারবােধ তৈরি হয়নি।

সবটা পরিষ্কারভাবে না জানলেও নন্দীগ্রামের ভূমি আন্দোলনের নেতৃত্বদের অনেকেই জানেন, লন্ডনে ও ইউরােপে মমতার জমি নীতি শুধু প্রশংসিতই নয়, ওসব দেশের থিঙ্ক ট্যাঙ্করা মনে করেন, মমতার জমি নীতি এবার ধনতান্ত্রিক পাশ্চাত্যেও মডেল হিসেবে অনুসৃত হবে। তারা দেখছেন মমতা’র প্রকল্প ইউনেস্কো থেকে পুরস্কৃত হচ্ছে। নােবেল বিজয়ীরা মমতা’র কমিটিতে থাকছেন। অনেকেই মনে করেন নন্দীগ্রামের হার্মাদদের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক আন্দোলনকে নিয়ে একটি সংগ্রহশালা হওয়া দরকার, যাতে নবী প্রজন্ম সেই ইতিহাস ভুলে না যায়। যেভাবে সেজ ও বানিয়াদের দালালরা এজেন্ট/মীরজাফরদের হাত ধরে নন্দীগ্রামের পবিত্র জমি আন্দোলনকে ভেঙে ফেলার চক্রান্ত করছেন তাতে একটি কনভেনশন সেন্টার দরকার। যেখানে বিশ্বের অ্যাকাডেমিক পণ্ডিতেরা মাঝে মাঝে আসবেন, জমির ওপর কৃষকের অধিকারকে কীভাবে সঠিক পথে আরও বেশি এগিয়ে নিয়ে যাও সে বিষয়ে মানুষকে বােঝাবেন। তাদের ধারণা মমতা চাইলে দেশ-বিদেশের পণ্ডিতেরা অবশ্যই আসবেন। দালালদের গতি রােধ দরকার।

Advertisement

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here