রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রীর উদ্যোগে কেল্লায় বসছে সত্যজিৎ রায়ের মূর্তি, হতে পারে সত্যজিৎ আরকাইভও

0

Last Updated on April 15, 2023 7:18 PM by Khabar365Din

৩৬৫দিন। অখ্যাত চিন্তমনি ফোর্ট পর্যটকদের কাছে সোনার কেল্লা মূকুল তোমার সোনার কেল্লা কোথায়? সোনার কেল্লা…..জয়,জয়, জয়সলমির।

১৯৭৪ সালে সত্যজিৎ রায়ের সোনার কেল্লা সিনেমা মুক্তি পাওয়ার পরই ভ্রমণপ্রিয় বাঙালির কাছে রাজস্থানের গুরুত্ব কেবল ঐতিহাসিক ভ্রমণ নয়, ইতিহাসের পাঠ্যসূচির গণ্ডি পেরিয়ে রিল লাইফ থেকে রিয়েল লাইফ হয়ে উঠেছে সত্যজিতের সোনার কেল্লা ছবির জন্যই। নব্বই শতাংশ পর্যটক এই জয়সলমির কেল্লাকে সোনার কেল্লা নামেই চেনে। ৪৯ বছর পার হয়ে গেলেও সোনার কেল্লার মুকুলের খোঁজে এখনও জয়সালমীরের ভিড় জমায় অসংখ্য ফেলুদা প্রেমী বাঙালি পর্যটকরা। সত্যজিতের সঙ্গে কিন্তু এই জয়সলমির কেল্লার সম্পর্ক সোনার কেল্লা ছবির অনেক আগে থেকেই। সেই ১৯৬৫ সাল,গুপী গায়েন বাঘা বায়েন। মনে পড়ে সেই দৃশ্যটা? কেল্লার ছাদে হল্লার রাজা কুচকাওয়াজ দেখছে, আর তার বিশাল রোব ধরে পিছনে পিছনে ঘুরছে এক বামন, জড়সড় হয়ে দাড়িয়ে মন্ত্রী,আর কেল্লার সামনের বিশাল প্রান্তরে সারি সারি উঠের পিঠে রুগ্ন,ক্ষয়িষ্ণু,আধপেটা খাওয়া সৈন্য।

এই হল্লা রাজার কেল্লাটাও কিন্তু জয়সলমিরের কেল্লা।যদিও অনেকেই জানেন না, সত্যজিতের সঙ্গে রাজস্থান এবং জয়সলমির কেল্লার যোগ কিন্তু সোনার কেল্লা ছবির অনেক আগে থেকেই। ১৯৬৮ সালে তাঁর কালজয়ী ছবি গুপী গায়েন বাঘা বায়েন ছবির প্রায় ৪০ শতাংশ শুটিং হয়েছে এই কেল্লাগুলোতে। হল্লা চলেছে যুদ্ধে,হল্লা হল্লা হল্লা… আমির ওমরাদের দাড় করিয়ে হল্লা রাজের সেই বিখ্যাত ফ্যাসিস্ট গান যদিও শুট হয়েছিল পরবর্তী বুঁদি কেল্লায়। কিন্তু যুদ্ধের সেই বিখ্যাত দৃশ্য , হাজার হাজার উট, সৈন্য সবই জয়সলমির কেল্লায়। বলতে গেলে এটাই হল্লা রাজার কেল্লা। চলচ্চিত্র প্রেমীদের অনেকেরই এই তথ্য জানা নেই,কারণ এই ছবিতে কেল্লা এক্সপ্লোর করাটা সত্যজিতের মূল উদ্দেশ্য ছিল না। যেটা সোনার কেল্লায় হল। রাতারাতি অখ্যাত কেল্লা নাম বদলে জনপ্রিয় হয়ে উঠল। ত্রিকুট পাহাড়ের উপর অবস্থিত চিন্তামণি ফোর্ট একদা রাজস্থানের নামজাদা কেল্লা গুলির তালিকায় ছিল না, সেইভাবে পর্যটকরাও ঘুরতে যেতেন না। কিন্তু সোনার কেল্লা সিনেমার মুক্তির পরই জয়সলমিরের এই ফোর্ট আন্তর্জাতিক মানচিত্রে জায়গা করে নিয়েছে।

সোনার কেল্লার ৫০ বছরে রাজস্থান সরকারের উদ্যোগ

এখন চিন্তামণি ফোর্টের বদলে সোনার কেল্লা নামেই পরিচিত। তাই এবার সত্যজিৎ রায়ের রায়ের মূর্তি স্থাপন করতে চলেছে রাজস্থানে কংগ্রেসের সরকার। অগামী বছরই সোনার কেল্লা সিনেমা সিনেমা মুক্তির অর্ধশতবর্ষ। ফেলুদার ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন করবে রাজস্থানের সরকার। সেই উপলক্ষেই জয়শলমিরে ফেলুদার স্রষ্টা সত্যজিৎ রায়ের মূর্তির উন্মোচন করা হবে। ইতিমধ্যেই মূর্তি স্থাপনের জন্য প্রস্তুতি শুরু করে দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে কলকাতায় রাজস্থান পর্যটনের অন্যতম মুখ্য আধিকারিক হিঙ্গল দন রতনু জানিয়েছেন, মরুভুমি ছাড়াও অসংখ্য বাঙালি প্রতিদিনই ভিড় করেন জয়শলমিরের কেল্লা দেখতে। জয়শলমিরের কেল্লা এখন সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন স্থান হয়ে উঠেছে। বার্ষিক অ্যানুয়াল ভিজিটরসের ভালো বাংলা কি হবে? আমাদের রিপোর্ট অনুযায়ী, জয়সলমিরের বার্ষিক পর্যটকদের মধ্যে ৬০ শতাংশ পর্যটকই বাঙালি।জয়শলমিরের জেলা প্রশাসনের তরফে প্রথমবার সত্যজিতের মূর্তি স্থাপনের ব্যাপারে রাজস্থান সরকারকে সুপারিশ করেছে। সেই সুপারিশ পাওয়ার পরই রাজস্থান সরকার সত্যজিৎ রায়ের মূর্তি স্থাপনে সম্মতি দেন।

দ্রুত এই মূর্তি স্থাপন করা হবে। রাজস্থান সরকারও সত্যজিৎ রায়ের মতো মহান ব্যক্তির মূর্তি স্থাপন করার উদ্যোগ নিতে পেরে গর্বিত।মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলত নিজে বিষয়টি নিয়ে উদ্যোগী হয়েছেন এবং এই সংক্রান্ত নির্দেশ দিয়েছেন নিজেই। আশা করছি আগামী সেপ্টেম্বরের আগেই কাজ সম্পূর্ণ হবে। ভবিষ্যতে আরও বেশি করে বাংলায় পর্যটক আমাদের রাজ্যে যাক সেটাই আমরা চাই। তিনি আরো জানান, ২০২১ সালে সত্যজিৎ রায়ের পুত্র তথা পরিচালক সন্দীপ রায়কে রাজস্থানের ডেজার্ট ফেস্টিভ্যালে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু সেই সময় তিনি কলকাতায় ছিলেন না। বাংলার সঙ্গে রাজস্থানের যোগ নতুন নয়। বহু বছর আগের থেকেই বাংলার সঙ্গে রাজস্থানের একটা গভীর যোগাযোগ রয়েছে। খেতরির রাজা অজিত সিং স্বামী বিবেকানন্দের বন্ধু ছিলেন। ভারত ভ্রমনে বেরিয়ে দীর্ঘদিন বিবেকানন্দ তাঁর আশ্রয়ে ছিলেন। এমনকি বিবেকানন্দর বিদেশ যাত্রার সব বন্দোবস্ত করে দেন এই রাজপুত রাজাই।
উল্লেখ্য, বিশ্বের একমাত্র জয়শলমিরের কেল্লায় এখনো জনবসতি রয়েছে। ৫ হাজার মানুষ বসবাস করেন। কেল্লার দরজাগুলি বন্ধ করে দিলে যা গোটা শহরে পরিনত হয়।

শুধু সোনার কেল্লা থেকে পর্যটনে আয় ৪ কোটি

জয়শলমিরের কেল্লার যে অংশে সিনেমার শুটিং করেছিলেন সত্যজিৎ রায়, কেল্লার ওই অংশকে যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে। যার মূল কারণ, বাঙালি এমনকি বহু দেশ বিদেশের পর্যটকরা রাজস্থানে পা রেখেই জয়শলমিরের কেল্লার খোঁজ করেন। রাজস্থান পর্যটক দপ্তরের হিসেব অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাঙালি পর্যটকদের থেকে রাজস্থান পর্যটন দফতরের ৪ কোটি আয় হয়েছে।
সত্যজিৎ রায় তার ফেলুদা সিরিজের প্রথম ছবি সোনার কেল্লার অধিকাংশ শুটিং রাজস্থানেই করেছিলেন। শুধু জয়শলমিরের কেল্লা নয়, বিকানির কেল্লাও দেখানো হয় সিনেমায়। যদিও বিকানির কেল্লায় ফেলুদা ও মন্দার বোসের একটি দৃশ্য ও সংলাপ বাদ পড়ে যায় সিনেমায়।