সিপিএম আমলের গণহত্যা, কসবা সেতুতে প্রকাশ্যে সতেরো আনন্দমার্গী সন্ন্যাসীকে পুড়িয়ে মারার বর্ষপূর্তি

0

Last Updated on April 30, 2023 7:25 PM by Khabar365Din

কেন গণশক্তিকে সর্বশক্তি দিয়ে প্রচারে নামতে হল, কেন বুদ্ধকে বলতে হল আনন্দমার্গীরা গণশত্রু

৩৬৫ দিন। ৩০ এপ্রিল ১৯৮২ সাল। আজকের দিনেই বালিগঞ্জের কাছে বিজন সেতুর উপরে প্রকাশ্য দিবালোকে ১৭ জন আনন্দমার্গী সন্ন্যাসীকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করার ঘটনা ঘটেছিল। যে ট্যাক্সিগুলিতে চেপে তাঁরা কলকাতার তিলজলায় একটি শিক্ষামূলক অধিবেশনে যাচ্ছিলেন, সেগুলি থেকে তাঁদের টেনে-হিঁচড়ে বের করা হয়। হত্যাকাণ্ডগুলি একইসাথে তিনটি আলাদা স্থানে ঘটিত হয় এবং বলা হয় হাজার হাজার লোক এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিল। এই ঘটনায় একেবারে প্রথম থেকে বারে বারে প্রতিটি তদন্তে নাম উঠে এসেছিল সিপিএমের প্রথম সারির নেতা এবং বিধায়কদের। কিন্তু তৎকালীন সিপিএম সরকার অথবা ঘটনার পরে প্রায় সাড়ে তিন দশক কেটে গেলেও হাইকোর্ট অথবা সুপ্রিমকোর্ট নিহত আনন্দমার্গী সন্ন্যাসীদের সুবিচার পাইয়ে দেওয়ার জন্য সিবিআই তদন্তের সুপারিশ করেনি কখনো। মমতা বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অমিতাভ লালার নেতৃত্বে তৈরি করেন আনন্দমার্গী তদন্ত কমিশন। সেই কমিশনে প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে নিরপেক্ষ সাক্ষীদের বয়ানে বারে বারে উঠে এসেছে প্রাক্তন মন্ত্রী তথা প্রখ্যাত সিপিএম নেতা কান্তি গাঙ্গুলির নাম। যদিও এখনো পর্যন্ত বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছেন কান্তি গাঙ্গুলী।

পূর্ব পরিকল্পিত গণহত্যার ব্লু প্রিন্ট সিপিএমের

১৯৮২ সালের ৩০ এপ্রিল বালিগঞ্জে ১৭ আনন্দমার্গীকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করার ঘটনা যে নিছক কোন ছেলে ধরা সন্দেহে পিটিয়ে মারার ঘটনা ছিল তা নয়। ঘটনার কিছুদিন আগে থেকেই এবং ঘটনার পরের কয়েক মাসে সিপিএমের দলীয় মুখপত্র কোন শক্তিতে যেভাবে লাগাতার আনন্দমার্গী সন্ন্যাসীদের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার পাশাপাশি তাদেরকে দেশ বিরোধী সন্ত্রাসবাদী বলে চিহ্নিত করার চেষ্টা হয়েছে বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে তার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। ১৯৮২ সালের ৪ জুলাই গণশক্তি কাগজের প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছিল একটি প্রতিবেদন – আনন্দমার্গীদের হিংসাত্মক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কনভেনশন। মনে রাখতে হবে তার মাত্র মাস তিনেক আগেই কলকাতার বুকে ঘটে গিয়েছে ১৭ জন আনন্দমার্গীকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করার মতো ঘটনা। অথচ তার পরেও অনুশোচনা তো দূরের কথা গণশক্তির প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য আনন্দমার্গীদের বিরুদ্ধে আয়োজন করা এই কনভেনশনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে স্পষ্ট ভাষায় তাদের বিরুদ্ধে উস্কানি দেওয়ার জন্য মন্তব্য করছেন। কনভেনশনে বক্তব্য রাখা হয়, ১৭ জন আনন্দমার্গীর মৃত্যু অবশ্যই দুঃখের কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে তাদের কার্যকলাপকে নিন্দা করা যাবে না। আন্তর্জাতিকভাবে এই সংগঠনকে সাহায্য করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় এরা বিভিন্নভাবে সংগঠন তৈরি করে যার মূল লক্ষ্য বিচ্ছিন্নতাবাদ।

শুধু তাই নয় গণশক্তির এই প্রতিবেদনে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের উপস্থিতিতেই আনন্দমার্গীদের বিরুদ্ধে রাজ্যের সর্বত্র গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য রীতিমত কমিটি তৈরির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সেখানে বলা হয় আনন্দমার্গীদের বিভেদ মূলক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে জনগণকে সতর্ক করে দেওয়ার জন্য এবং জনগণকে আনন্দময় কিদের কার্যকলাপের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি আনন্দমার্গীদের বিরুদ্ধে সিপিএমের আক্রমণ যে অব্যাহত থাকবে তা জানিয়ে গণশক্তিতেই লেখা হয়েছিল, এই সম্মেলন মনে করে আনন্দমার্গী একটি গণতন্ত্র বিরোধী বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন। এরা জাতিবিদ্বেষের প্রচারক এবং কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য অনুযায়ী ভারত বিরোধী প্রচারে লিপ্ত। বিগত কয়েক বছর ধরে এরা এই অঞ্চলে সন্ত্রাস সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এমনকি এই ঘটনার মাত্র দুদিন পরে ২মে ১৯৮২ সালে বামফ্রন্টের তৎকালীন চেয়ারম্যান কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্তর আবেদন প্রকাশিত হয় গণশক্তির পাতায়। যেখানে সিপিএমের নেতাদের ওপর থেকে দাড়িয়ে দাঁড়ানোর জন্য শুধুমাত্র ছেলে ধরা সন্দেহে আনন্দমাগীদের হত্যার ঘটনা চালানোর চেষ্টার পাশাপাশি থেকে শুধুমাত্র অপপ্রচার বলে দাবি করেছিলেন কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্ত।

শের সিংয়ের জবানবন্দিতে ব্লু প্রিন্ট ফাঁস

তবে দোর্দণ্ডপ্রতাপ হার্মাদ নেতা কান্তি গাঙ্গুলী থেকে শুরু করে বিজন সেতুতে আনন্দমার্গি হত্যাকাণ্ডে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর নীরব থেকে প্রত্যক্ষ মত দেওয়ার ঘটনা যিনি প্রকাশ্যে এনেছিলেন তিনি হলেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার তৎকালীন উপজেলা শাসক শের সিং। তিনি নিজের বয়ানে গোটা ঘটনাটি বিবৃত করেছিলেন নিরপেক্ষভাবে। আনন্দমার্গী গণহত্যার পেছনে সিপিএম নেতাদের প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে থাকার ঘটনা প্রকাশ্যে জানিয়ে দেওয়ার অপরাধে দক্ষিণ ২৪ পরগনার এডিশনাল ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট পথ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় শের সিংকে। এই হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি ২৪ পরগণার অতিরিক্ত জেলাশাসক ছিলেন। সেন্ট্রাল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ট্রাইব্যুনালকে দেওয়া একটি দরখাস্তে ( ১৯৯৪ এর নং ১১০৮) তিনি অভিযোগ জানান যে, উক্ত বিষয়ে এই কমিউনিস্ট সরকারের কথায় কান দিতে অস্বীকার করায় তাঁকে সাসপেন্ড করা হয়েছিল। শের শিংকে বদলি করে দেওয়া হলেও পরবর্তীকালে তার দেওয়া বয়ান থেকে জানা গিয়েছিল ৩০ এপ্রিল বালিগঞ্জে আনন্দমার্গীদের হত্যার ঘটনা ঘটলেও তার যাবতীয় পরিকল্পনা তৈরি হয়েছিল জানুয়ারি মাসেই। দক্ষিণ কলকাতার ১৪.৩ একরের একটি জমি যেখানে বর্তমানে সন্তোষপুর স্টেডিয়াম, সেই জমি দখলকে কেন্দ্র করে বিতর্কের সূত্রপাত।

এই জমি দখলের জন্য অন্যতম বড় ভূমিকা নিয়েছিলেন সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়। তিনি দক্ষিণ ২৪ পরগণের তৎকালীন জেলা শাসক রানু ঘোষ কে ফোন করে বারে বারে চাপ সৃষ্টি করেন।
শেষ শিং নিজের বয়ানে জানিয়েছিলেন সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় এই জ্যোতি বসুকে বুঝিয়েছিলেন যে আনন্দমার্গীরা জমিটাকে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তার কথামতোই জ্যোতি বসু ২০ জানুয়ারি একটি চিঠি পাঠান। শের সিং নিজের ইন্টারভিউতে জানিয়েছিলেন বাইরে থেকে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে ভদ্রলোক বলে মনে হলেও কুখ্যাত এই গণহত্যার ঘটনা ঘটেছিল সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের সুপারিশেই। তবে এই সমস্ত তথ্য ফাঁস করে দেওয়ার অপরাধে মাত্র নয় মাস আগে দক্ষিণ ২৪ পরগনার অতিরিক্ত জেলাশাসক হিসেবে যোগ দেওয়া সত্ত্বেও তাকে বদলি করে দেওয়া হয় অন্যত্র। কারণ তিনি জানুয়ারি মাসেই সিপিএমের এই গণহত্যার ব্লু প্রিন্টের কথা জানতে পেরে তৎকালীন জেলা শাসক রানু ঘোষকে তার আশঙ্কার কথা জানিয়ে বলেছিলেন যে জমি দখল কে কেন্দ্র করে ৪-৫ জন খুন হয়ে যেতে পারে।

তার সেই আশঙ্কায় সত্যি হয় ৩০ এপ্রিল আরো ভয়াবহভাবে। ১৬ জানুয়ারি থেকে মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত সব ঘটনা তিনি স্বাক্ষর করে লিপিবদ্ধ করেন নিজের বয়ানে। বিজন সেতু ১৯৮২ বইটিতে শের সিংয়ের একটি বিস্তারিত ইন্টারভিউ রয়েছে। অন্যদিকে আনন্দমার্গী হত্যাকাণ্ডের সিপিএম নেতাদের যোগসাজশ মুছে ফেলার জন্য ঘটনার তদন্তের দায়িত্ব থাকা ওসি গঙ্গাধর ভট্টাচার্যকে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল সিপিএম জমানাতেই। এই ঘটনার তদন্তে যুক্ত তিলজলা থানার ওসি গঙ্গাধর ভট্টাচার্যকে ১৯৮৩ সালের ৩১ অক্টোবর গুলি করে খুন করা হয়। শের সিং এর অভিযোগ এই খুনের পিছনেও মাস্টারমাইন্ড ছিলেন সিপিএম নেতা কান্তি গাঙ্গুলী। ওসি গঙ্গাধর ভট্টাচার্যের বিধবা স্ত্রী মমতা ভট্টাচার্য সিপিএম নেতৃত্বের দিকেই তার অভিযোগের আঙ্গুল তুলে বলেন যেহেতু তার স্বামী একজন সৎ পুলিশ অফিসার ছিলেন এবং আনন্দমার্গীদের হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন করেননি – তাই তাঁকে খুন হতে হয়েছিল।